শিরোনাম
ইউনিয়ন আ’লীগের কমিটি নিয়ে এমপির গাড়ি দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ মঙ্গলবার নব-নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরগণের শপথগ্রহণ কুমিল্লা সিটি নির্বাচন: মেয়র কাউন্সিলরদের শপথ ৫ জুলাই পাবনা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৪২ বোতল ফেন্সিডিল সহ ১জন আটক মেয়র আরফানুল হক রিফাতকে কুমিল্লা ক্রীড়া পরিবারের সংবর্ধনা কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার নারীদের স্বাবলম্বী করতে সুনেহেরা ক্রিয়েশন এর বিনামূল্যে ওয়ার্ক সপ ফরিদপুরে ৪০ মন ওজনের কালাপাহাড় নামক গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ২৫ লক্ষ টাকা  কুমিল্লায় ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা নারীর দায়ের করা মামলায় ধর্ষক গ্রেপ্তার  জামালপুর রেলওয়ে ওভারপাসে আরো ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেন প্রধানমন্ত্রী, ব্যয় দাড়ালো ৪৫০ কোটি টাকা ঢাবির ‘খ’ ইউনিটে প্রথম রাজেন্দ্র কলেজের নাহনুল কবির নুয়েল
“পবিত্র রমজানে ইতেকাফের ফজিলত,তাৎপর্য এবং উপকারিতা “

“পবিত্র রমজানে ইতেকাফের ফজিলত,তাৎপর্য এবং উপকারিতা “

পারভীন আকতার :

বছর ঘুরে নির্দিষ্ট সময়ে আসে পবিত্র মাহে রমজান।তিরিশ রোজায় দশদিন করে ভাগ হয় রহমত,মাগফেরাত ও নাজাতের মধ্য দিয়ে।পবিত্র কোরআনে রমজান মাসকে অত্যন্ত বরকতময় মাস হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।অনুরূপ হাদীস শরীফেও তার সমুজ্জ্বল বর্ণনা পাওয়া যায়।এই পবিত্র মাসেই নাজিল হয়েছে পবিত্র কোরআন পরিপূর্ণরূপে যাতে বর্ণিত আছে মানবজীবন তথা সৃষ্টিকূলের যাবতীয় কর্মপন্থা ও উত্তম জীবনবিধান।হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ রজনী পবিত্র শবে কদর একমাত্র এই মাসেই পাওয়া যায়।
ইতেকাফের ফজিলত ও তাৎপর্যঃ
রমজানের শুরুর দশদিন রহমতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হশ।তার পরের দশদিন মাগফিরাত কামনায় পৃথিবীর মানুষ ব্যাকুল হয়ে খোদাকে স্মরণ করে।শেষের দশদিন নাজাত তথা মুক্তি যত খারাপ,অন্যায় থেকে মানুষ মনে প্রাণে আল্লাহর ধ্যানে নিবিষ্ট থাকে।নাজাতের এই দশদিনে রোজাদারগণ ইতেকাফ পালন করে যাতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ আরো প্রশস্ত হয়।আমাদের প্রিয় নবী হয়রত  মুহম্মদ( সাঃ) তাঁর ওফাতের আগ পর্যন্ত রমজানের শেষের দশদিন ইতেকাফ পালন করেছেন।তাঁর ইতেকাফের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল কারণ একনিষ্ঠ মনে, ধ্যানে আল্লাহকে কাছে পাওয়ার এই সুযোগ তিনি শত ব্যস্ততা থাকা স্বত্ত্বেও হাতছাড়া করতে চাইতেন না।একবার তিনি যেকোন কারণে পবিত্র রমজানে ইতেকাফ করতে পারেননি।তিনি তাঁর ওফাতের বছরে ২০ দিন ইতেকাফ করে তা পূর্ণ করেছেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ইতেকাফকে গুরুত্ব দিয়েছেন।তিনি বলেছেন”স্মরণ কর,যখন আমি পবিত্র কা’বাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও এবং নিরাপদ স্থান বানালাম এবং আদেশ দিলাম যে,তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে তোমাদের জন্য নামাযের স্থানরূপে গ্রহন কর।আর আমি ইব্রাহিম ও ঈসমাইলকে দায়িত্ব দিয়েছেছিলাম যে,তোমার আমার কা’বা ঘর তাওয়াফকারী,ইতেকাফকারী ও রুকুকারীদের জন্য পবিত্র কর।”(সূরা বাকারাহ-আয়াত ১২৫)।
এতে প্রমাণিত হয় যে,আল্লাহতা’আলা ইতেকাফকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।তিনি কা’বা শরীফ তৈরি করেছেন তাওয়াফ,ইতেকাফ এবং সালাতের জন্য।প্রথমে তাওয়াফ এবং পরে নামাজ আদায় করা হয়।পবিত্র কা’বা শরীফে  যেকোন ধরণের ইবাদত জায়েজ ও পূণ্যময়।
ইতেকাফ একটি আরবী শব্দ। আরবী ‘আকফ’ ধাতু হতে এটি উদগত।’আকফ’ এর বাংলা অর্থ হলো অবস্থান করা।ইতেকাফের শাব্দিক অর্থ হলো নিজেকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায়  অবস্থান করানো,আবদ্ধ করা বা আটকে রাখা।যার ইংরেজি পরিভাষা হলো abide,shut,impound, coted,bide ইত্যাদি।২০ রমজানে আসরের নামাযের পর সূর্যাস্তের আগে থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ  দেখা না যাওয়া পর্যন্ত ইতেকাফ করতে হয়।পুরুষগণ যে মসজিদে জামাতের সাথে সালাত আদায় করা হয় সেই মসজিদে ইতেকাফ করবে।এটি সুন্নাতে মোয়াক্কাদা কিফায়া।এবং মহিলারা নিজের ঘরে নির্দিষ্ট কক্ষে ইতেকাফ পালন করবে।সেই স্থানটি মসজিদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতি রেখে ইতেকাফকারী অন্য কোথাও অহেতুক ঘুরাঘুরি করতে পারবে না।এটি রাসুল (সাঃ) এর পক্ষ হতে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত আমল।প্রতিটি পাড়ার হয়ে একজন পুরুষকে অবশ্যই ইতেকাফ পালন করতে হয়। না হয় পুরো পাড়ার লোকজন গুনাহগার হবেন।এতে ঐ ব্যক্তিকে ইতেকাফ পালনের জন্য কোনরকম উজরত বা বখশিস বা পারিশ্রমিক প্রদান করা ইসালামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।রাসূল (সাঃ) বলেছেন,তোমরা যারা ইতেকাফ করবে তারা দুইটি ওমরাহ ও দুইটি হজ্জের সমান সওয়াব পাবে।(বুখারী শরীফ)।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)হতে বর্ণিত,রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন,”যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ইতেকাফ পালন করবে তারা জাহান্নামের আগুন মধ্যে তিন পরিখা সমান দূরত্ব সৃষ্টি করবেন এবং প্রত্যেকটি পরিখার দূরত্ব হবে দুই দিগন্তের চেয়েও বেশি।”(বায়হাকি)
হয়রত আয়েশা ( রাঃ) বলেছেন,”রাসূলপাক (সাঃ) প্রতি রমজানের শেষ দশদিন ইতেকাফ পালন করতেন।তাঁর ওফাতের আগ পর্যন্ত তিনি ইতেকাফ পালন করে গেছেন।এবং তাঁর স্ত্রীগণও ইতেকাফ পালন করেছেন।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত,রাসূলেপাক (সাঃ) আরো বলেছেন,”ইতেকাফকারী নিজেকে পাপ মুক্ত রাখে এবং তাঁর জন্য পূণ্য জারি করা হয়।”(মিশকাত)।
ইতেকাফ চলাকালে স্ত্রীদের সাথে কী রূপ আচরণ করবে তা আল্লাহতা’লা এরশাদ করেছেন,”আর তোমরা মসজিদে ইতেকাফকালে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না।”(সূরা বাকারাহ,আয়াত-১৮৭)
হুজুরপাক (সাঃ) এর অনেক হাদীসে ইতেকাফ সম্পর্কে বিস্তারিত  তথ্য পাওয়া যায়।এতে তিনি ইতেকাফকালে বেশি বেশি কোরআন তেলওয়াত, নফল ইবাদত জিকির,দরুদপাঠ,দান সদকা এবং তসবিহ-তাহলীল করতে বলেন।
ইতেকাফকালে দুনিয়াবী কাজকর্ম যেমন মোবাইলে অহেতুক অপ্রয়োজনীয় কথা বলা,চ্যাট করা,অতিরিক্ত মাত্রায় ইন্টারনেট ব্রাউজ করা,অনলাইনে সময় নষ্ট করা,কারো সাথে বেহুদা কথাবার্তা বলা,ইবাদতের সময় অন্যকাজে লিপ্ত থাকা,হাসাহাসি করা,গল্পগুজবে মেতে উঠা,উচ্চস্বরে কথা বলা,লেনদেন করা,ঝগড়াঝাটি করা,গীবত করা,মসিজদ হতে যখনতখন শরীয়তের কাজ ছাড়া বের হওয়া বর্জনীয় করা হয়েছে।খাওয়ার দরকার হলে পরিবার পরিজন মসজিদে দিয়ে যাবে অথবা মসজিদ কমিটি তার ব্যবস্থা করবেন।
ইতেকাফের দশদিনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র  ইতেকাফকারী সঙ্গে নিয়ে যাবেন।যেমনঃ কাপড়চোপড়, এলার্ম ঘড়ি,জায়নামাজ, সাবান,বিছানার কাপড়,মশারী,খাবারের থালাবাসন,পানির গ্লাস,টর্সলাইল,প্রয়োজনীয় ঔষধাদি,পবিত্র কোরআন,হাদীস এবং ইসলামী বই ইত্যাদি।এর বেশি  অতিরিক্ত কিছুই ইতেকাফে নিয়ে যাওয়া যাবে না । ইতেকাফকারী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে প্রযোজনীয় ইসলামের তরিকতের কথা,শরীয়তের কথা বলতে পারবেন তবে তা সীমিত আকারে বলবেন।ইতেকাফকারী গোসল করবেন,চুল আঁচড়াবেন, সুগন্ধি দ্রব্যবাদি বস্তু, ভাল পোশাক পরিচ্ছদ পরতে ও ব্যবহার করতে পারবেন।
ইতেকাফকালে অতিরিক্ত ঘুমানো যাবে না।অত্যধিক আহার করা যাবে না।যতটুকু সম্ভব রাতভর বেশি বেশি ইবাদত করতে হবে,জিকির আযকার করতে হবে।পবিত্র কোরআন পড়তে হবে।সুবহান্নাাল্লাহ,আলহামদুলিল্লাহ,আল্লাহ আকবর,তাওবাহ-ইস্তেগফার, দোয়া দরূদে এবং ইবাদতে সর্বাধিক মশগুল থাকতে হবে।শরীয়া বিষয়ক পুস্তক পাঠে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে।হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ রজনী পবিত্র শবে কদরের তালাশ করতে হবে ২০ রোজার পর যেকোন বিজোড় রাতে।ইতেকাফে পবিত্র শবে কদর পাওয়া যায় খুবই সহজে।যেহেতু সারাক্ষণই আল্লাহর জিকিরে,ইবাদতে থাকেন ইতেকাফকারী।
ইতেকাফকারী নিয়ত করে ইতেকাফে যাবেন।রোজা রাখবেন এবং প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন পুরুষ মহিলা জানাবাত এবং স্ত্রীরা হায়েজ নেফাস হতে পাক হবেন।সর্বদা পাক পবিত্র থাকবেন।পুরুষরা জমায়েতে নামায আদায় করা হয় এমন মসজিদে ইতেকাফ পালন করবেন।
ইতেকাফকারী মসজিদে পানাহার ও ঘুমানো জায়েজ আছে।তবে খুবই শালীনতার সাথে তা করতে হবে যাতে কোন মুসল্লীর সমস্যার কারণ না হয়।
ইতেকাফের প্রকারভেদঃ
ইতেকাফ তিন প্রকার।যথাঃসুন্নাত ইতেকাফ, ওয়াজিব ইতেকাফ ও নফল ইতেকাফ।
সুন্নাত ইতেকাফ হলো ২০ রমজানে সূর্যাস্তের আগে থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়া পর্যন্ত। এটিকে সুন্নাতে মোয়াক্কাদা কিফায়া বলে।মহল্লাবাসী পক্ষ হতে যেকোন একজন ব্যক্তি এই ইতেকাফ পালন করবেন।
ওয়াজিব ইতেকাফ হলো  নজর বা মানত করা ইতেকাফ।, কোন ব্যক্তি যেকোন উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দিন ইতেকাফ  পালন করবে এমন নিয়ত করলে তা ওয়াজিব ইতেকাফ হয়।যতদিন মানত করবে ততদিন ইতেকাফ পালন ওয়াজিব।সুন্নাত ইতেকাফ ভঙ্গ করলে তা পূনরায় পালন করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
নফল ইতেকাফে কোন নির্দিষ্ট দিন বা সময়ের পরিমাপ নেই।যেকোন দিন, সময়ে ইতেকাফ করা যাবে।শুধু নিয়ত করে ইতেকাফের জন্য মসজিদে প্রবেশ করতে হবে।অল্প সময়ের জন্যও এই নফল ইতেকাফ করা যায়।
ইতেকাফের উপকারিতাসমূহঃ
১) ইতেকাফ করলে মানুষ সবধরনের গুনাহর কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে সক্ষম হয়।এতে শরীর মন পবিত্র থাকে।মনে প্রশান্তি লাভ হয় আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ধ্যানে।
২)ইতেকাফকারীর জন্য জাহান্নামের আগুন মধ্যে তিন পরিখা দূরে থাকে যা  দুইদিগন্তের দূরত্বের চেয়েও বেশি।
৩) ইতেকাফকারী সমস্ত গুনাহ আল্লাহতা’আলা ক্ষমা করে দেন এবং একটি নিষ্পাপ শিশুর মত বের হয়ে আসেন পবিত্র হয়ে ইতেকাফ শেষে।
৪) ইতেকাফকারী দুনিয়াবী সবধরণের ঝগড়া বিবাদ, জুলুম অনিষ্ট থেকে দূরে থাকেন।এতে সমাজের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়।মনোমালিন্য অনেকটাই দূর হয় খোদার সান্নিধ্যে লাভে।
৫) ইতেকাফের ফলে নিজের উপর আত্মনিয়ন্ত্রণ অনেক প্রতিষ্ঠা হয়, সচ্চরিত্র গঠনে সহায়তা করে এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।খারাপ কাজে মন ধাবিত হয় না আর।
৬)ইতেকাফকারী দুইটি ওমরাহ ও দুইটি হজ্জের সমান সওয়াব পান।এতো আল্লাহর বড় নেয়ামতের কথা।
৭) সকল প্রকার গীবত,সমালোচনার পথ থেকে নিজেকে ইতেকাফকারী হেফাজত করতে পারেন খুব সহজে।
৮)ইতেকাফকারী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নিজেকে আল্লাহর কাছে উজাড় করে ইবাদতে সঁপে দিতে সক্ষম হন।
উত্তম কোন কিছু পেতে হলে একান্ত সাধনার বিকল্প নেই।ইসলাম শান্তির ধর্ম।এতে কোন মারামারি,দলাদলির স্থান নেই।একান্তই যা প্রয়োজন তাই ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় এই ক্ষণকালের জীবন অতিবাহিত করতে।ইসলামের সুগন্ধি ফুলেল সুভাষ ইতেকাফকারীর অন্তর পবিত্র করে দেয় এবং প্রকৃত অর্থে ইসলামের মূল উপজীব্য বাণী,মর্মকথা একনিষ্ঠভাবে বুঝতে সক্ষম হন।ইতেকাফের পালনে জীবনের চলার পথে বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে সহজতর হয়।আল্লাহ তা’লা সুপথগামী করেন এবং ইহকাল পরকালের নাজাতের পথ খুঁজে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে ইতেকাফ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed BY SmartHostBD.com