শিরোনাম
ইউনিয়ন আ’লীগের কমিটি নিয়ে এমপির গাড়ি দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ মঙ্গলবার নব-নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরগণের শপথগ্রহণ কুমিল্লা সিটি নির্বাচন: মেয়র কাউন্সিলরদের শপথ ৫ জুলাই পাবনা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৪২ বোতল ফেন্সিডিল সহ ১জন আটক মেয়র আরফানুল হক রিফাতকে কুমিল্লা ক্রীড়া পরিবারের সংবর্ধনা কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার নারীদের স্বাবলম্বী করতে সুনেহেরা ক্রিয়েশন এর বিনামূল্যে ওয়ার্ক সপ ফরিদপুরে ৪০ মন ওজনের কালাপাহাড় নামক গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ২৫ লক্ষ টাকা  কুমিল্লায় ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা নারীর দায়ের করা মামলায় ধর্ষক গ্রেপ্তার  জামালপুর রেলওয়ে ওভারপাসে আরো ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেন প্রধানমন্ত্রী, ব্যয় দাড়ালো ৪৫০ কোটি টাকা ঢাবির ‘খ’ ইউনিটে প্রথম রাজেন্দ্র কলেজের নাহনুল কবির নুয়েল
“মধ্যবিত্তের ঈদ কেমন কাটে?”

“মধ্যবিত্তের ঈদ কেমন কাটে?”

পারভীন আকতার :

হাঁটুভাঙ্গা এক সংসার জীবনের নাম মধ্যবিত্ত পরিবার।ঘরের চাল আছেতো বসার জায়গায় টুপ টুপ পানি পড়ছে টিনের চালের ফুটো দিয়ে।ঘরণী কোথাও রান্নার ডেক্সি কিংবা কোথাও বালতি বসিয়ে বৃষ্টির পানি ঘর ভিজে একট্টা কাদাময় হওয়ার আগে ব্যবস্থা নেন।সন্তানরা কেউ খেয়ে না খেয়ে পড়ছে কেউ বা খেলছে মাঠে দূরন্তপনায়।আর সংসারের একমাত্র আয়ক্ষম ব্যক্তি বাবা সেই সকালে তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণির চাকরী করে দিন শেষে পথেঘাটে যা বাজারসদাই পান নিতান্তই প্রয়োজনীয় তার কিছুটা থলে ভর্তি করে আনেন প্রিয় পরিবারের নিত্য নৈমিত্তিক কদাচিত প্রয়োজন মেটাতে। এতেও নানা বাহনা ছলচ্যুতর আশ্রয়ও নেয়া লাগে।ঘরণী যখন বলে,”এটা কেন আননি?” তখন বাধ্য হয়েই বলতে হয়,”পাইনি।”আসলে এতো ডাহা মিথ্যা কথা।পকেটে যে আর টাকা পয়সা নেই লজ্জায় পরিবারে বলা যায় না।এভাবেই প্রতিনিয়ত অভিনয় করে চলেন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।সুখে থাকার ভান করেন আসলে ভিতরটা দারুণ পীড়াদায়ক বেদনার।নূন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা মধ্যবিত্তের।
সমাজের এলিট শ্রেণী যদি তা একবার বুঝত অন্তর দিয়ে তবে সাগ্রহে মধ্যবিত্তদের গোপনে সহায়তা দিত।কারণ মধ্যবিত্তরা সহজে কারো কাছে হাত পাতে না লজ্জায়।রাষ্ট্রও বৈরী আচরণ করে মধ্যবিত্তদের সাথে।বিজিএফ কার্ড বা রেশন কার্ড, বয়স্ক ভাতা,বিধবা ভাতার কার্ড ইত্যাদি কোন ধরনের  রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা আওতায় নেই মধ্যবিত্তরা।ছেলেমেয়েরা সেই ক্লাস নাইন থেকে টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে দেখা যায় অহরহ।এ কেমন উঁচু নীচুর বৈষম্যে তৈরির সমাজ ব্যবস্থা!তবে মধ্যবিত্তের সন্তানরা সবচেয়ে বেশি সাকসেসফুল হয়।তখন ধনী ঘরের ছেলে বা মেয়ে বিয়ে দিতে তাদের সাথে ধনীশ্রেণী  উঠে পড়ে লাগে।এতো রত্ম তারা সহজেই বুঝে যান। ততদিনে তারা মধ্যবিত্তের কালিমামুক্ত হয়ে নব্য এলিট শ্রেণিতে পদার্পণ করে কি না!অথচ এই অবস্থানে আসতে অনেক কাঠগড় পুড়িয়ে আসতে হয়েছে।তখন কিন্তু এলিটদের অবহেলার নজরই বেশি ছিল মধ্যবিত্তের পরিবারের দিকে।নাক ছিটকাত যখন শুনত তাদের সন্তান পড়তে বা খেলতে গিয়ে মধ্যবিত্তের সন্তানদের সাথে মিশে।ছেলে/মেয়েটা একেবারে উচ্ছনে গেল তখন বলতে বাঁধত না এলিটদের।এসবতো সমাজে প্রতিনয়ত ঘটছে,চোখে দেখা একেবারে!এই হলো কঠিন বাস্তবতা।
আমরা কি কখনো ভেবেছি এই মধ্যবিত্তের ঈদ উৎসবগুলো কেমন কাটে?নিজের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।তবেই বিষয়টা আরো পরিষ্কার হবে।
আমার বয়স তখন নয় কি দশ।এখনো স্পষ্ট মনে আছে আমার বাবা বস্তা ভর্তি শাড়ী,লুঙ্গি, সেমাই চিনি আরো আহার্য সামগ্রী আনতেন।কয়েকজন লোক টানতে টানতে তা বাড়ীর উঠোনে রাখত।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম।এতকিছু কাদের জন্য?সাথে থাকত নতুন টাকার কয়েকশো বান্ডিল!এটা ঠিক রোজার লাইলাতুল কদরের আগের দিন বা ঐ দিন হতো।
লাইন ধরে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকত আর আমার বাবা স্বহস্তে গরীব দুঃখীদের টাকা,শাড়ী,লুঙ্গি আর ঈদের সেমাই চিনি তেল আনুষাঙ্গিক ছয়জনের পরিবারের সমান দ্রব্যাদি দিতেন।আমরা বোবার মত চেয়ে থাকতাম।এত বুঝতাম না এসব কেন দিচ্ছেন। আমার মাও দান হস্তসিদ্ধ বিদুষী মহিলা।আমার বাবা একবার প্রকাশ্যে দিলে আমার মাকে গিয়ে কেউ ফের অনুনয়-বিনয় করলে মা দ্বিতীয়বার তাদের আঁচল ভরে জিনিসপত্র, চাল আর টাকা পয়সা দিতেন।আমি মাঝে মাঝে ওদের চালাকি বুঝতাম।তবে কিছু বলার মত সাহস তখন ছিল না।আর যারা মুখ ফুটে চাইতে পারত না মানে মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের ঘরে ঘরে লোক মারফত বস্তা ভরে খাবার,কাপড় প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠিয়ে দিতেন বাবা মা।এখনো সেই রেওয়াজ চালু আছে আমাদের পরিবারে। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে আমার বাবাই ছিলেন একমাত্র উচ্চ-মধ্যবিত্ত। যাঁর গাড়ি,বাড়ী,ব্যবসা ছিল আর মানুষের সেবা করার ব্রত ছিল বেশুমার।রোজা কিংবা কোরবান নয় সারাবছরই তাঁর দানের হাত খুবই প্রশস্ত ছিল।আমাদের এলাকায় এখনো আমার বাবার যথেষ্ট সম্মান ও নাম-ডাক আছে।তবে এতে আমাদের পরিবারের কারো কখনো অহংকার করার মত কিছুই ছিল না।এটি দেখতে দেখতে আমাদের কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গিয়েছিল।রীতিমত অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।এখনো তা স্বাভাবিক নিয়মে চলছে।
আমার বাকী চাচা জেঠারা ছিলেন অপেক্ষাকৃত গরীব।তাদের দুই হাতে বাবা সহায়তা করতেন।ঈদে আমাদের গায়ে জামা দেয়ার আগে আমার চাচাতো জেঠাতো ভাইবোনদের দিতেন।তখন তাদের মুখে কী যে আনন্দের ঝিলিক দেখতাম মনটা খুশিতে ভরে যেত।আমিও আমার নতুন জুতো কসমেটিক  চাচাতো,জেঠাতো বোনদের সাথে শেয়ার করতাম।ওদের তৃপ্তির ঢেঁকুর দেখে আমি ধন্য হয়ে যেতাম।কোরবানির ঈদেও আমার বাবা তিনটা বড় বড় গরুর পাশাপাশি ছাগল কোরবানি দিতেন।এবং আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী অনাহারীদের সমানভাবে ভাগ করে দিতেন।আমার বাবার আমল ছিল এমনি সমৃদ্ধ।আমরা সন্তান হিসেবে বাবার মত সাকসেস না হলেও বাবার উদার হৃদয়খানি পেয়েছি।আমাদের উপার্জনের একটি অংশ আমরা অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেই।যদিও তা খুবই নগণ্য।আয় যেমন ব্যয়ও তেমন।যারা টাকার অভাবে পড়ালেখা করতে পারত না, খেতে পেত না অথচ বলতে লজ্জা পেত সেই মধ্যবিত্তের যাতনাভরা পরিবারে  আমার মা বাবা পালা করে সহায়তা করতেন,ছায়ার মত পাশে দাঁড়াতেন।এখন তাদের অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত সমাজে।হয়তো আমার বাবা মা সহায়তার হাত না বাড়ালে আজ তারা এই পর্যায়ে পৌঁছতে অনেক বেগ পেতে হত। তারা আজো যে তা মনে রেখে শ্রদ্ধা করে, সভা অনুষ্ঠানে  আমাদের ডাকেন এতেই আমাদের ভাল লাগা।আমার বাবা মা সমাজের ১৭ টা মেয়েকে একাই নিজ খরচে বিয়ে দিয়েছেন এবং বিয়ের পর আনুষাঙ্গিক সামাজিক কর্মকাণ্ড একাই সামলিয়েছেন!ভাবা যায়! বর্তমানে যখন কেউ আপন ভাইবোনেরও খবর নেয় না।আর এভাবেই সমাজের একটি বৈপ্লবিক আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছেন আমাদের পিতা মাতা।সমাজে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।আমরা গর্ববোধ করি এমন মা বাবার সন্তান হতে পেরে।এখন আমাদের পরিবারের দেখাদেখি অনেক পরিবারও এগিয়ে এসেছে উন্নত সমাজ বিনির্মানে।আর এভাবেই সমাজ তথা একটি উন্নত রাষ্ট্র তৈরি হয়।
সমাজের বিত্তবান যদি এগিয়ে আসে তবেই মধ্যবিত্ত বেঁচে যায়।কারণ মধ্যবিত্তরা কখনোই মুখে সহযোগিতা চাইতে দেখা যায় না।তাদের বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না।এ তাদের আত্মসম্মানে লাগে ভীষণ।ঈদে মধ্যবিত্তদের সন্তানরা বাবার আসার পথ চেয়ে থাকে।তাঁর হাতে কোন থলে দেখলে তারা উচ্ছ্বসিত হয়।আজ হয়তো তাদের বাবা ঈদের কাপড় এনেছে।থলে খুলতেই দেখা যায় কারো জন্য জামা আবার কারো জন্য সস্তা দামের চটি জুতা এনে কোন রকম বুঝ দেয়া হয়েছে।সন্তানদের কেউ কেউ তা মানতে চায় না।কারণ পাশের বাড়ীর আলমগীর তার ক্লাসে পড়ে সহপাঠী, একসাথে মাঠে খেলে,,খেলার সাথী। সে ভাল জামা জুতো পেল আর নিজের ভাগ্যের কী হাল!তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের অধিকাংশ  সন্তানরা বাবা মায়ের আয়ের অবস্থা,পরিস্থিতি  দেখে চুপটি মেরে থাকে।কিছু বলবার মত সাহস কোথায় ওদের!দু’বেলা ডাল ভাত খেয়ে মাদুর পেতে কোন রকম খাতা কলম বই জোগাড় করে পড়তে পারে,স্কুলে যেতে পারে এই ঢের!পরিবারে আরো সদস্য আছেন যারা বয়স্ক মানুষ,ফুফু বা চাচা।তাদেরও কিছু না কিছু ঈদে কিনে দেয়া সমীচীন।এসব জোগান দিতে দিতে পরিবারের রোজগারকারী নিজের জন্য ঈদের কাপড় আর কিনতে পারেন না।যদি কেউ বলে, “এবার তুমি নিজের জন্য কিছু কিন?” তখন কর্তা ধমকের সুরে বলেন,”কী দরকার বাপু।গতবছরের পাঞ্জাবিটা ধোলাই করে পরলেই হবে।বুড়ো বয়সে এত আর কে দেখে?আর চটিজোড়া পালিশ করিয়ে নিলেই হবে।চকচক করবে দেখো।”তার মানে নিজেই রোজগার করে সংসারের সবার খুশির জন্য নিজের শখ,ইচ্ছে, খুশির বলিদান করে মধ্যবিত্তের কর্তাকর্তীগণ যা কাউকেই বুঝতে দেন না।মধ্যবিত্তের পরিবারের একমাত্র প্রশান্তি শুধু সততা ও স্বচ্ছতার হাসিটুকু যা পৃথিবীতে অমূল্য।রাজার ঘরেও এমন সুখ শান্তি মেলা ভার।অভাবে থেকেও মধ্যবিত্তরা মন খুলে হাসতে পারেন কারণ তাদের ভিতর কপটতা,মিথ্যাচার আর ধন সম্পদের প্রাচুর্য নেই।আজগুবি কালো টাকা, সম্পদের হিসাবও তাই রাখা লাগে না।একেবারে ঐদিকে টেনশন ফ্রী।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিন্মমধ্যবিত্তের করাল গ্রাসে আবদ্ধ। সেখানে যে ক’টা পরিবার মধ্যবিত্তের খাতায় নাম লিখিয়েছে তাদের অবস্থা বর্তমান চড়া বাজার দরে জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।কয়েকদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম অভাবের তাড়নায় স্বামী স্ত্রী দু’,জনেই আত্মহত্যা করেছে।কী মর্মান্তিক সমাজের বাস্তবিক প্রেক্ষাপট!দেশের উন্নয়ন হচ্ছে।তবে তা রাস্তা ঘাট,উড়াল সেতু,পদ্মাসেতু বা কর্ণফুলী টানেল বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে।ইন্টারনেট ব্রাউজ,ফোর জি,ফাইভ জি!কিংবা মেট্রো রেলের হাওয়ায় চড়ে।বাস্তবে অন্ন জোগান, অর্থের সংকট, জীবনমানের অধোগতি রয়েই গেছে।ক্ষুধার তাড়নায় শিশু স্কুলে আসলে ছটফট করে যা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি।এসবের সমাধান কী তবে?
মানুষের জীবন জীবিকার দায়িত্ব রাষ্ট্র যতক্ষণ নেবে না, মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন যতক্ষণ রাষ্ট্র কর্তৃক জাতীয়করণ হবে না ততক্ষণ আলতা বানুর ফুল বিক্রির টাকায় পানি পানও কষ্টকর হবে।তারা উড়াল সেতু নয় পেটে দু’মুঠো ভাত চায়।ঈদে একটা ভাল কাপড় চায়,ঈদের দিন ভাল মন্দ খুশি মনে খেতে চায়।ঈদের একটি দিন অন্ততঃ নতুন কাপড় পরে ঈদগাহে যেতে চায়।সকলের সাথে কোলাকুলি করতে চায়। ঈদের এই দিনটি আনন্দমুখর সুখে শান্তিতে কাটাতে চায় দরিদ্র, নিন্মবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।রাষ্ট্র কি তা উপহার দেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed BY SmartHostBD.com